চায়ের নেশা জীবনের ভালোবাসা

 


এক চুমুক চায়ে ঘুরে আসা যায় চায়ের রাজ্যে। চা নিয়ে জানা - অজানা কথা জানবো।


☕ চা বেশির ভাগ মানুষের পছন্দ । আমার মত মানুষের তো নেশা ভালোবাসা। চা খাই কিন্তু এই চায়ের কাহিনী জানি না আজ সেটাই জানার চেষ্টা করবো।

💹 চায়ের প্রথম ব্যবহার হয় চীন দেশে খ্রিস্টিপূর্ব ২৭০০ সালে । চাইনিজ পৌরাণিক গল্প মতে বহুকাল আগে সেন সং নামে চাইনিজ এক রাজা ছিলেন তিনি অনুধাবন করেছিলেন যে সাধারণ তাপমাত্রার পানির চেয়ে হালকা গরম পানি পান করলে শরীর ভালো থাকে ।

⛩️একদিন তিনি ভ্রমণে বেরিয়ে যথারীতি পানি গরম করছিলেন তখন হঠাৎ একটি গাছের কিছু পাতা উড়ে সেই গরম পানিতে পরে এবং সেই পানি পান করে তিনি সতেজ অনুভব করে ।

গল্পে উল্লেখিত গাছটি ছিল এবং পানীয়টি ছিল চা। এভাবেই চায়ের যাত্রা শুরু হয় ।

প্রাচীনকালের মধ্য চীনের ইয়াং লিঙ্ক অঞ্চলে মানুষ মারা গেলে, মৃত মানুষের সঙ্গে তার কবরে নানা উপহার সামগ্রী রাখা হতো । সেসব সামগ্রীর মধ্যে চা পাতাও ছিল অন্যতম ।

কাল ক্রমে চীন থেকে জাপানে ছড়িয়ে পড়ে চায়ের প্রসার। একটা সময় চা এতটাই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে জাপানে, যে জাপানিরা চা কে নিজেদের ধর্মীয় ও ঐতিহ্যগত প্রথা রূপ দান করেৎএমনকি এখনও চা কে কেন্দ্র করে বিশেষ উৎসব পালন করা হয় সেখানে ।

চায়ের কাপে শুধু  রিতিনীতি বা সামাজিক জড়িত নয় বরং রাজনৈতিক নানা কৌশল  তুলে ধরা যায় একে উদাহরণস্বরূপ ব্রিটিশরা চায় এতটাই আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে যে সপ্তদশ শতকে চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক অর্থনৈতিক ও সর্বোপরি কূটনৈতিক সম্পর্কে ভাঙ্গন ধরলে তারা বিপদে পড়ে যায় পরবর্তীতে চায়ের জন্য চীনের ওপর থেকে নির্ভরশীলতা হ্রাস করতে তারা ভিন্ন এক পন্থা খুঁজতে মরিয়া হয়ে পড়ে ।

👨‍🔬রবার্ট ফরচুন নামের এক অফিস উদ্ভিদ বিজ্ঞানী কে ব্রিটিশরা নিয়োগ দেয় যাতে সেই চীন থেকে চায়ের গাছ পাচার করে আনতে পারে। কথা মত রবার্ট পর্যন্ত ২০ হাজারের মতো গাছ চীন থেকে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে আনে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সেই গাছগুলো ভারতের দার্জিলিং এ রোপণ করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সেই গাছগুলো ভারতের দার্জিলিং এ রোপন করে আলাদা এক গড়ে তুলে চায়ের সাম্রাজ্য ।

চা কে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক যে কথাটি না বললে নয় তা হলো আমেরিকার স্বাধীনতা আন্দোলন ।১৭৭৩ সালে আমেরিকার জনগণ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী অগ্রাসনের বিরুদ্ধে একজোট হয়ে ফুসে ওঠে। 

ব্রিটিশ সরকার চায়ের ওপর পর বসালে আমেরিকার বোস্টন শহরের বাসিন্দারা সে সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানায়। এর মধ্যে এর মাধ্যমেই বোস্টন টি পার্টি গড়ে ওঠে। এ পার্টির সদস্যগণ ব্রিটিশ জাহাজে আসা ৩৪২ কন্টেনিয়ার চা সাগরে ফেলে দেন। এই চা কেন্দ্রিক শুরু হয় এই প্রতিবাদ, আমেরিকার স্বাধীনতার আন্দোলনের গতিকে আরো বেকবান করে তোলে ।

🍵বিশ্বে প্রতি পাঁচ জন মানুষের একজনের সকালটাই শুরু হয় চা দিয়ে আবার গোটা পৃথিবীতে প্রতিদিন কত কাপ চা বানানো হয় জানেন ? সারা পৃথিবীতে একদিন এই প্রায় তিন বিলিয়ন কাপ চা তৈরি হয় আমাদের মধ্যে অনেকেই আছেন চায়ের প্রতি আসক্ত ।

🫖গোটা বিশ্বে প্রায় তিন হাজার রকমের চা পাওয়া যায় ।একেক চায়ের একেক বৈশিষ্ট্য তবে সব ধরনের চা পাতায় তবে সব ধরনের চা পাতায় আসে ক্যামেলিয়া, সিনেসিক নামক এক ধরনের চিরহরিৎ গুল্ম থেকে চায়ের মধ্যে এত সব বৈচিত্র্যতা জন্ম নেয় মূলত চা চাষের ধরন উৎপাদনের কৌশল ও আবহাওয়ার উপর ভিত্তি করে ।

 🌐শুধু ভিনদেশেরই নয়, বাঙালিরাও অনেক উপাখ্যানের রচিয়তা এই চা বাংলা যা শুধুমাত্র একটি পানীয় নয়, কতশত আবেগ মাখা, কত উচ্ছলতা, কর্মব্যস্ত দিন বা একাকিত্বে পার করা অবসন্নতার স্মৃতি বিজড়িত চুমুক। যা সর্বজনীন ভাবে থাকে বাঙালির প্রতিটি আড্ডায় আপ্যায়ন ও আভিজাত্য ।

১৮০০ শতাব্দীর প্রথম ভাগে ভারতবর্ষের আসাম ও তৎসংলগ্ন এলাকায় চা চাষ শুরু হয় | তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলার কর্ণফুলী নদীর তীরে চা আবাদের জন্য ১৮২৮ খ্রিস্টাব্দে জমি বরাদ্দ হয়। কিন্তু বিভিন্ন কারনে সেখানে চা চাষে বিলম্বিত হয়। ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম শহরের বর্তমান চট্টগ্রাম ক্লাব সংলগ্ন এলাকায় একটি চা বাগান প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যা কুন্ডদের বাগান নামে পরিচিত।  এটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর পরই বন্ধ হয়ে যায়। তারপর ১৮৫৪ খ্রিষ্টাব্দে মতান্তরের ১৮৪৭ খ্রিস্টাব্দে সিলেট শহরের এয়ারপোর্ট রোডের কাছে মালনীছড়া চা বাগান প্রতিষ্ঠিত হয়। মূলতঃ মালনীছড়া বাংলাদেশের প্রথম বানিজ্যিক চা বাগান ।

🇧🇩দেশ স্বাধীন পূর্ব পর্যন্ত বাংলাদেশে শুধুমাত্র দুইটি জেলায় চা আবাদ করা হতো, একটি সিলেট জেলায় যা সুরমা ভ্যালি নামে পরিচিত ছিল , আর একটা চট্টগ্রাম জেলায় যা হালদা ভ্যালি নামে পরিচিত ছিল । বর্তমানে বৃহত্তর সিলেটের সুরমা ভ্যালিকে ছয়টি ভ্যালিতে ভাগ করা হয়েছে যথা

  •  লস্কর ভ্যালি,
  • বালিশিরা ভ্যালি
  • মনু্-দলাই ভ্যালি
  • লংলা ভ্যালি 
  • নর্থ সিলেট ভ্যালি ।

এবং হালদা ভ্যালিকে চট্টগ্রাম ভ্যালি করা হয় ।

১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় চা বাগান প্রায় বিদ্ধস্ত হয়ে যায় । বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই শিল্পকে টেকসই খাতের উপর দাঁড় করানোর জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

BTIMC গঠন করে পূর্নবাসন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন ।

চা উৎপাদনের অতীতের সকল রেকর্ড অতিক্রম করে ২০২৩ সালে দেশের ১৬৮টি চা বাগান এবং ক্ষুদ্রয়াতন চা বাগান থেকে পরিমাণ মোট ১০২.৯২ মিলিয়ন কেজি চা উৎপাদিত হয়েছে । 

১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে  বাংলাদেশে চা বাগানের সংখ্যা ছিল ১৫০টি, বর্তমানে চা বাগানের সংখ্যা ১৬৮টি ।

'উন্নয়নের পথনকশা: বাংলাদেশে চা শিল্প ' শিরোনামে একটি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে যা আগামীতে দেশের চা শিল্পকে আরও  এগিয়ে নিতে কার্যকারী ভূমিকা পালন করবে।


🥇প্রথম চা কি ছিল : যদিও প্রথম চায়ের  ধরনের সঠিক তথ্য  পাওয়া যায় না, তবে এটি মূলত সবুজ চা হিসেবে  চিত । পরবর্তীতে বিভিন্ন  ধরনের চা যেমন -

  • কালো চা 
  • উলং চা এবং
  • সাদা চা বিকশিত হয় 

চা প্রথমে চীনে জনপ্রিয় হলেও, বর্তমানে এটি বিশ্বব্যাপী একটি জনপ্রিয়  পানীয়।

চা সারা বিশ্বের জনপ্রিয় একটি পানীয়, যার অনেক স্বাস্থ্য উপকারিতা আছে তেমনি কিছু অপকারিতা ও রয়েছে।

চায়ের উপকারিতা: চা শরীরের জন্য উপকারী । যেমন :

  1. অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরকে সুরক্ষা  প্রদান করে এবং বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে ।
  2. হৃদ যন্ত্রের ঝুঁকি কমায় ।
  3.  মানসিক সতেজতা   বৃদ্ধি করে ।
  4.  পেটের হজমে সাহায্য  করে ।
  5.  ওজন কমাতে সাহায্য করে । 

চায়ের অপকারিতা : তাই যেমন উপকারিতা রয়েছে তেমনি অপকরিতাও রয়েছে । যেমন :

  1. ক্যাফিন এর  প্রভাবের কারণে অনিদ্রা, মাথা ব্যথা ,অস্থিরতা এবং হৃদ স্পন্দন দ্রুত হতে পারে ।
  2. অতিরিক্ত চা পান করার ফলে শরীরের আয়রন শোষণ কমিয়ে দেয় ফলে আয়রনের অভাব দেখা দিতে পারে ।
  3. চায়ে ট্যানিন    থাকার কারণে দাঁতের গায়ে দাগ  পড়তে পারে এবং দাঁতের এনামেল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে ।
  4. বেশি চা খেলে পেটে অসস্তি এবং গ্যাসের সমস্যা বাড়াতে পারে ।


তবে, যা যদি পরিমাণ মতো এবং সঠিকভাবে হওয়া যায়, তবে এটি শরীরের জন্য উপকারী হতে পারে, তবে অতিরিক্ত খাওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত ।

চায়ের কিছু বানানো পদ্ধতি বা রেসিপি :

☕দুধ চায়ের রেসিপি :

 উপকরণ : 

  • দুধ এক কাপ 
  • পানি আধা কাপ বা স্বাদমতো 
  • চিনি স্বাদমতো 
  • এলাচ একটি ইচ্ছা অনুযায়ী 

প্রস্তুত প্রণালী: 

  1. একটি পাত্রে পানি গরম করতে দিন  পানি একটু  গরম হয়ে এলে তাতে চা পাতা ও এলাচ যদি ব্যবহার করেন দিয়ে দিন । 
  2. চা পাতা ফুটে উঠলে এবং রঙ ছড়ালে এতে দুধ যোগ করুন।  
  3. এবার দুই থেকে তিন মিনিট দুধ ও চাপাতি মিশ্রণ কে ফুটতে দিন যতক্ষণ না চায়ের রং এবং ঘ্রাণ ভালোভাবে মিশে  যায় । 
  4. মিষ্টি স্বাদ চাইলে চিনি যোগ করুন এবং আরেকটু ফুটিয়ে নিন। 
  5. চায়ের মিশ্রণটি থেকে কাপের মধ্যে ঢালুন এবং গরম গরম পরিবেশন করুন ।

🍵মাসালা চায়ের রেসিপি: 

উপকরণ: 

  • পানি দুই কাপ 
  • চা পাতা এক টেবিল চামচ 
  • দারুচিনি এক টুকরা 
  • এলাচ দুইটি 
  • লবঙ্গ দুইটি 
  • আদা এক ইঞ্চি কুচি করে কাটা 
  • চিনি স্বাদমতো 
  • দুধ আধা কাপ 

প্রস্তুত প্রণালী: 

  1. একটি পাত্রে পানি গরম করে তাতে দারুচিনি এলাচ লবঙ্গ এবং আদা দিন 
  2. মসলা কিছুক্ষণ ফুটিয়ে চা পাতা যোগ করুন 
  3. দুধ এবং চিনি দিন 
  4. এবং দুই থেকে তিন মিনিট  ফুটিয়ে উঠতে দিন 
  5. নামিয়ে ছেকে পরিবেশন করুন । 

🫚আদা চায়ের রেসিপি :

উপকরণ: 

  • পানি দুই কাপ 
  • চা পাতা টেবিল চামচ 
  • আদা ১ ইঞ্চি 
  • চিনি বা মধু স্বাদমতো 
  • দুধ আধা কাপ ইচ্ছা 

প্রস্তুত প্রণালী: 

  1. একটি পাত্রে পানি গরম করুন 
  2. পানি ফুটে উঠলে আদা কুচি দিন 
  3. এবং দুই মিনিট ফুটতে দিন চা পাতা যোগ করুন এবং 
  4. এক থেকে দুই মিনিট ফুটতে দিন 
  5. মিষ্টি স্বাদ চাইলে চিনি বা মধু যোগ করুন 
  6. দুধ চাইলে এখন দুধ যোগ করুন এবং আর একটু ফুটিয়ে নামিয়ে নিন 
  7. গরম গরম পরিবেশন করুন । 


🍋লেবু চায়ের রেসিপি:  

উপকরণ : 

  • পানি দুই কাপ 
  • চা-পাতা এক টেবিল চামচ 
  • লেবুর রস এক চা চামচ 
  • চিনি স্বাদমতো 

প্রস্তুত প্রণালী: 

  1. একটি পাত্রে পানি গরম করে তাতে চা পাতা যোগ করুন 
  2. ফুটে উঠলে নামিয়ে ছেকে নিন 
  3. এবার লেবুর রস এবং চিনি মিশিয়ে পরিবেশন । 
আরো অনেক ধরনের চা রয়েছে । যা পান করে আমাদের শরীর মন দুটই ভালো থাকে। 

Post a Comment

0 Comments